এক নজরে

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা বিশ্বের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির একটি। এর মূল কার্যক্রম হল শাখা — যেখানে স্বয়ংসেবকরা প্রতিদিন সকাল বা সন্ধ্যায় মিলে শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম, প্রার্থনা ও আলোচনা করেন। সংঘ কখনও সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেয় না, তবে তার আদর্শগত প্রভাবে বহু সংগঠন গড়ে উঠেছে, যারা মিলে সংঘ পরিবার নামে পরিচিত। বর্তমানে সারা ভারতে ৬০,০০০-এরও বেশি শাখা পরিচালিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ স্বয়ংসেবক সংঘের সাথে যুক্ত। আরএসএস-এর মূল লক্ষ্য হল ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজকে সংগঠিত করা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখা।

বিস্তারিত ইতিহাস ও সময়রেখা

১৯২৫: ২৭ সেপ্টেম্বর, বিজয়াদশমীর দিন, ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার নাগপুরের রেশমীবাগে প্রথম আরএসএস শাখা শুরু করেন। এই দিনটিকে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়। হেডগেওয়ার চেয়েছিলেন ভারতীয় যুবকদের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা, যাতে তারা দেশের সেবা করতে পারে।

১৯২৫-১৯৪০: প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ১৫ বছর হেডগেওয়ারের নেতৃত্বে আরএসএস নাগপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। স্বয়ংসেবকদের জন্য একটি কঠোর শৃঙ্খলার কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রতিদিনের শাখা, প্রার্থনা, শরীরচর্চা ও বৌদ্ধিক আলোচনা — এই রুটিন চালু হয়। ১৯২৯ সালে নাগপুরে প্রথম আরএসএস ক্যাম্প (শিবির) আয়োজন করা হয়, যা পরবর্তীকালে একটি বার্ষিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। হেডগেওয়ার ১৯৩০-এর দশকে সারা ভারত ভ্রমণ করে আরএসএস-এর বার্তা ছড়িয়ে দেন এবং অনেক জায়গায় নতুন শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪০: ২১ জুন, ১৯৪০ — ডা. হেডগেওয়ারের মৃত্যু। তাঁর মৃত্যুর পর মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর (গুরুজী) দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক হন। গুরুজী ৩৩ বছর (১৯৪০-১৯৭৩) এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে আরএসএস একটি ছোট আঞ্চলিক সংগঠন থেকে একটি বিশাল জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়।

১৯৪৭: ভারতের স্বাধীনতা লাভ। আরএসএস স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ না নিলেও, সংঘের স্বয়ংসেবকরা দেশভাগের সময় হিন্দু ও শিখ শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দিল্লি, পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে বিশাল ত্রাণ শিবির স্থাপন করা হয়।

১৯৪৮: ৩০ জানুয়ারি — মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ড। এই হত্যার জন্য আরএসএস-কে দায়ী করা হয় এবং ৪ ফেব্রুয়ারি সংঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। লক্ষ লক্ষ স্বয়ংসেবক গ্রেপ্তার হন। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয় যে সংঘের সঙ্গে এই হত্যার কোনো সম্পর্ক নেই এবং ১২ জুলাই ১৯৪৯-এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। গুরুজী ১৮ মাস জেলে থাকার পর মুক্তি পান।

১৯৫০-১৯৬০: নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর আরএসএস পুনরায় সংগঠিত হয় এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ১৯৫২ সালে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৫ সালে ভারতীয় জন সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় (পরবর্তীতে বিজেপি)। সেবা ভারতী, বিদ্যা ভারতী ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৩: গোলওয়ালকরের মৃত্যুর পর মধুকর দত্তাত্রেয় দেবরস (বাপুজী) তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক হন (১৯৭৩-১৯৯৪)। তাঁর সময়েই সংঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। সেবা ভারতী, বিদ্যা ভারতী, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, ভারতীয় কিষাণ সংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠিত ও সম্প্রসারিত হয়। ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস-এর অনেক নেতা ও স্বয়ংসেবক গ্রেপ্তার হন।

১৯৯৪-২০০০: রাজেন্দ্র সিং (রাজ্জু ভাইয়া) চতুর্থ সরসঙ্ঘচালক হন। তাঁর আমলে আরএসএস আরও আধুনিকীকরণের দিকে এগিয়ে যায়। রাজ্জু ভাইয়ার নেতৃত্বে সংঘের সামাজিক সেবা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।

২০০০-২০০৯: কে.এস. সুদর্শন পঞ্চম সরসঙ্ঘচালক হন। তাঁর আমলে আরএসএস তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তার উপস্থিতি বাড়ায়। সংঘের আদর্শ ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

২০০৯-বর্তমান: ড. মোহন ভাগবত ষষ্ঠ ও বর্তমান সরসঙ্ঘচালক। তাঁর নেতৃত্বে আরএসএস অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ লাভ করেছে। শাখার সংখ্যা, স্বয়ংসেবকের সংখ্যা ও সংঘ পরিবারের প্রভাব — সব দিক থেকেই সংঘ শক্তিশালী হয়েছে। ভাগবতের নেতৃত্বে আরএসএস সামাজিক মাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংঘের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাতার জীবন ও দর্শন

ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ১৮৮৯ সালের ১ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন — কলকাতার মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও হিন্দু সমাজের দুরবস্থা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে ভারতীয় সমাজে সংগঠনের অভাবই দেশের দুর্বলতার মূল কারণ। তাঁর প্রত্যয় ছিল — সংগঠিত হিন্দু সমাজই ভারতের শক্তি। তিনি ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর নেতৃত্ব দেন। হেডগেওয়ারের আদর্শ — "সংগঠনই শক্তি" — আজও সংঘের মূল ভিত্তি।

আদর্শ ও দর্শন

আরএসএস-এর মূল দর্শন হল একাত্ম মানববাদ (Integral Humanism), যা পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় প্রদত্ত। এই দর্শন ব্যক্তি, সমাজ, জাতি ও বিশ্বের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করে। এটি পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয়ের সমালোচনা করে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক-সামাজিক মডেল উপস্থাপন করে।

সংঘের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আদর্শগত ভিত্তি হল হিন্দুত্ব — ভি.ডি. সাভারকরের দেওয়া সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধারণা। হিন্দুত্ব মানে ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়। সংঘ মনে করে, ভারতীয় উপমহাদেশের সব অধিবাসী — ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে — একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশীদার। এই ঐতিহ্যকে সংঘ 'হিন্দু' নামে চিহ্নিত করে।

সংঘের মতে, ভারত = হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু হিন্দু বলতে কোনো একক ধর্মের অনুসারী নয় বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। সব ধর্মের মানুষ এখানে সমান অধিকার পাবেন, কিন্তু দেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি হবে ভারতীয় (হিন্দু) ঐতিহ্য। সংঘের আরেকটি মূলনীতি হল সেবা — নিঃস্বার্থ সেবা। স্বয়ংসেবকরা কোনো প্রতিদানের আশা না করে সমাজের সেবা করে।

"আমরা হিন্দু জাতির সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ চাই। ভারতের অতীত গৌরবময়, বর্তমান সংকটময়, কিন্তু ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।" — মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর (গুরুজী)

নেতৃত্বের ইতিহাস ও বিবরণ

আরএসএস-এর সর্বোচ্চ পদ হল সরসঙ্ঘচালক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ছয়জন সরসঙ্ঘচালক দায়িত্ব পালন করেছেন:

  1. ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার (১৯২৫-১৯৪০): প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সরসঙ্ঘচালক। ১৯২৫ সালে নাগপুরে প্রথম শাখা স্থাপন করেন। তাঁর নেতৃত্বে আরএসএস-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়। তিনি সংঘের শৃঙ্খলা, রুটিন ও সংগঠন কাঠামো তৈরি করেন।
  2. মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর / গুরুজী (১৯৪০-১৯৭৩): দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক। সর্বাধিক সময় (৩৩ বছর) দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে আরএসএস একটি ছোট আঞ্চলিক সংগঠন থেকে একটি শক্তিশালী জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। তিনি 'বুঞ্চ অফ থটস' (বিচার ধারা) গ্রন্থে আরএসএস-এর আদর্শ ও দর্শন বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
  3. মধুকর দত্তাত্রেয় দেবরস / বাপুজী (১৯৭৩-১৯৯৪): তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক। তাঁর আমলে সংঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। জরুরি অবস্থার (১৯৭৫-৭৭) সময় তিনি কারাবরণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই আরএসএস একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।
  4. রাজেন্দ্র সিং / রাজ্জু ভাইয়া (১৯৯৪-২০০০): চতুর্থ সরসঙ্ঘচালক। তাঁর নেতৃত্বে সংঘের সামাজিক সেবা কার্যক্রম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি আরও সম্প্রসারিত হয়। তিনি সংঘের আধুনিকীকরণ ও যুবকদের আকর্ষণের উপর জোর দেন।
  5. কে.এস. সুদর্শন (২০০০-২০০৯): পঞ্চম সরসঙ্ঘচালক। তাঁর আমলে আরএসএস আন্তর্জাতিক স্তরে তার উপস্থিতি জোরদার করে। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সংঘের বার্তা প্রচারের উপর জোর দেন।
  6. ড. মোহন ভাগবত (২০০৯-বর্তমান): ষষ্ঠ ও বর্তমান সরসঙ্ঘচালক। একজন পশু চিকিৎসক ও পূর্ণকালীন স্বয়ংসেবক। তাঁর নেতৃত্বে সংঘ অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ লাভ করছে। তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংঘের উপস্থিতি বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বেই আরএসএস সামাজিক মাধ্যম, ডিজিটাল যোগাযোগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সরকার্যবাহ: বর্তমান সরকার্যবাহ হলেন দত্তাত্রেয় হোসবালে, যিনি সরসঙ্ঘচালকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী। তিনি সংঘের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

মূল কার্যক্রম ও প্রকল্প

শাখা: আরএসএস-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কার্যক্রম। প্রতিদিন সকাল বা সন্ধ্যায় স্বয়ংসেবকরা নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হন, শরীরচর্চা করেন, যোগাসন করেন, প্রার্থনা, গান ও আলোচনা করেন। সারা ভারতে ৬০,০০০-এরও বেশি শাখায় নিয়মিতভাবে কার্যক্রম চলে। শাখায় স্বয়ংসেবকদের শারীরিক, মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে। এখানে দেশাত্মবোধক আলোচনা, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণ ও ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণ শিবির: আরএসএস নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করে। গ্রাম স্তর থেকে শুরু করে জাতীয় স্তর পর্যন্ত — স্বয়ংসেবকদের জন্য সংঘ শিক্ষা বর্গ (প্রশিক্ষণ বর্গ) পরিচালিত হয়। এখানে স্বয়ংসেবকদের শারীরিক প্রশিক্ষণ, বৌদ্ধিক আলোচনা, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও সংগঠন দক্ষতা শেখানো হয়। তৃতীয় বর্ষের (তৃতীয় বর্গ) স্বয়ংসেবকরাই পরবর্তীকালে সংঘের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন।

সেবা কার্যক্রম: সেবা ভারতী, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, একল বিদ্যালয় প্রভৃতির মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ ও সমাজসেবা। আরএসএস-এর স্বয়ংসেবকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও পুনর্বাসন, রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য শিবির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোভিড মহামারির সময় আরএসএস স্বয়ংসেবকরা লক্ষ লক্ষ মানুষকে খাদ্য, ওষুধ ও অক্সিজেন সরবরাহ করে অভূতপূর্ব সেবা প্রদান করেন।

শিক্ষা: বিদ্যা ভারতী ও সরস্বতী শিশু মন্দিরের মাধ্যমে দেশাত্মবোধক শিক্ষা। বর্তমানে ২৫,০০০-এরও বেশি বিদ্যালয় এই নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হয়। এছাড়া বিবেকানন্দ কেন্দ্র, দীনদয়াল গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি গবেষণা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সাংস্কৃতিক জাগরণ: বিবেকানন্দ কেন্দ্র, সংস্কার ভারতী, সাহিত্য পরিষদ প্রভৃতির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য ও শিল্পের প্রচার ও প্রসার। বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র ও অন্যান্য মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি ও আদর্শের প্রচার।

প্রকাশনা: পঞ্চজন্য (হিন্দি সাপ্তাহিক), অর্গ্যানাইজার (ইংরেজি সাপ্তাহিক), হিন্দুস্থান সমাচার (সংবাদ সংস্থা) — এই প্রকাশনাগুলির মাধ্যমে আরএসএস তার আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে।

সমাজ সংস্কার: সমাজিক সমরসতা মঞ্চের মাধ্যমে জাতপাত ভেদাভেদ দূরীকরণ, মন্দির প্রবেশ আন্দোলন, কন্যা ভ্রুণ হত্যা বিরোধী প্রচারণা ও নারী শিক্ষা প্রসারে কাজ করা হয়।

পরিবেশ সুরক্ষা: আরএসএস পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গঙ্গা সমগ্র প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গা নদী পরিষ্কার রাখার প্রচেষ্টা, বৃক্ষরোপণ অভিযান ও জল সংরক্ষণ প্রকল্প পরিচালিত হয়।

সংঘ পরিবার (Sangh Parivar)

আরএসএস-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠা বহু সংগঠন একসঙ্গে সংঘ পরিবার নামে পরিচিত। প্রায় ২০০টিরও বেশি সংগঠন এই পরিবারের অন্তর্গত। এদের মধ্যে প্রধানগুলি হল:

  • রাজনৈতিক: ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), ভারতীয় জন সংঘ (ঐতিহাসিক)
  • ছাত্র: অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) — বিশ্বের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন
  • শ্রম: ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস) — ভারতের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন
  • কৃষি: ভারতীয় কিষাণ সংঘ (বিকেএস)
  • ধর্ম: বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), বজরং দল, দূর্গা বাহিনী
  • শিক্ষা: বিদ্যা ভারতী, সরস্বতী শিশু মন্দির, একল বিদ্যালয়
  • সেবা: সেবা ভারতী, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, সেবা ইন্টারন্যাশনাল
  • অর্থনীতি: স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ, লঘু উদ্যোগ ভারতী, গৃহক পঞ্চায়েত
  • নারী: রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি, দুর্গা বাহিনী
  • মিডিয়া: পঞ্চজন্য, অর্গ্যানাইজার, বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র, হিন্দুস্থান সমাচার
  • আদিবাসী: বনবাসী কল্যাণ আশ্রম
  • সাংস্কৃতিক: সংস্কার ভারতী, সাহিত্য পরিষদ, বিবেকানন্দ কেন্দ্র, সংস্কৃত ভারতী
  • পেশাগত: অধ্যাপক পরিষদ, অরোগ্য ভারতী, বিজ্ঞান ভারতী, কৃড়া ভারতী, সাহাকার ভারতী, ভূতপূর্ব সেনা সেবা পরিষদ

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিস্তার

আরএসএস ভারতের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সক্রিয়। এর প্রধান কার্যালয় কেশব ভবন, নাগপুর, মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। সারা ভারতে ৬০,০০০-এরও বেশি নিয়মিত শাখা পরিচালিত হয়। মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরল, আসাম প্রভৃতি রাজ্যে সংঘের বিশেষ শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।

আরএসএস-এর আন্তর্জাতিক শাখা হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ (এইচএসএস) বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে সক্রিয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, কেনিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা, ফিজি, মরিশাস, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম, গায়ানা প্রভৃতি দেশে আরএসএস-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত স্বয়ংসেবকরা সংঘের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সমাজসেবা ও দুর্যোগ ত্রাণে ভূমিকা

আরএসএস-এর স্বয়ংসেবকরা যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে প্রথম সারিতে থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় শরণার্থী ত্রাণ, ২০০১ সালের গুজরাট ভূমিকম্প, ২০০৪ সালের সুনামি, ২০০৫ সালের কাশ্মীর ভূমিকম্প, ২০০৮ সালের বিহার বন্যা, ২০১৩ সালের উত্তরাখণ্ড বন্যা, ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প, ২০১৮ সালের কেরালা বন্যা, ২০২০-২১ সালের কোভিড মহামারি এবং ২০২৩ সালের ওড়িশা ট্রেন দুর্ঘটনায় আরএসএস স্বয়ংসেবকরা ব্যাপক ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে। আরএসএস-এর রক্তদান শিবিরগুলির মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়।

লোগো ও প্রতীক

আরএসএস-এর প্রতীক হল গেরুয়া পতাকা (ভগবা ধ্বজ), যা বীরত্ব, ত্যাগ ও জ্ঞানের প্রতীক। ভগবা ধ্বজ আরএসএস-এর সব শাখা ও অনুষ্ঠানে উত্তোলন করা হয়। এখানে ব্যবহৃত লোগোটি আরএসএস-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (rss.org) থেকে নেওয়া। সংঘের প্রার্থনা গান — "নমস্তে সদা বৎসলে মাতৃভূমে..." — প্রতিদিন শাখায় গাওয়া হয়। আরএসএস-এর মূলমন্ত্র হল "সংগঠনই শক্তি" (संघटन ही शक्ति है) এবং "সেবা, সমরসতা, সংগঠন" (सेवा, समरसता, संगठन)।

সমর্থন ও সমালোচনা

সমর্থকেরা বলেন: আরএসএস শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও সেবামূলক কাজের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজকে সংগঠিত করছে। এর সদস্যরা বিপর্যয় মোকাবিলা, রক্তদান, শিক্ষা প্রসার ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংঘের শাখা পদ্ধতি ভারতীয় যুবকদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি, শারীরিক সক্ষমতা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে। আরএসএস-এর সামাজিক সেবা কার্যক্রম — বিশেষ করে দুর্যোগ ত্রাণ — সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত।

সমালোচকেরা বলেন: আরএসএস একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন যা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাড়ায়। এর আদর্শগত অবস্থান সংখ্যালঘুদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আরএসএস-এর বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের গান্ধী হত্যা মামলা এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ ঐতিহাসিকভাবে উঠেছে — যদিও অনেক ক্ষেত্রে আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সমালোচকেরা আরও বলেন যে আরএসএস রাজনৈতিক দল বিজেপির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

একজন সচেতন পাঠকের পক্ষে উভয় দিকের তথ্য জানা জরুরি। এই নির্দেশিকা শুধুমাত্র তথ্যসংকলনমূলক, পক্ষপাতমূলক নয়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

আরএসএস একটি সংগঠন হিসেবে নিজে কোনো পুরস্কার গ্রহণ করে না, তবে সংঘের আদর্শে অনুপ্রাণিত বহু ব্যক্তি ও সংগঠন বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছে। আরএসএস-এর দুর্যোগ ত্রাণ ও সমাজসেবা কার্যক্রম বিভিন্ন সরকার ও সংস্থার কাছ থেকে প্রশংসিত হয়েছে। সংঘের স্বয়ংসেবকরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছেন। সংঘের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষাক্ষেত্রে অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি

আরএসএস ভবিষ্যতে ভারতীয় সমাজের আরও গভীরে প্রবেশ করার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সংঘের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে: (ক) শাখার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করে ১ লক্ষে পৌঁছানো, (খ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, (গ) আরও বেশি সমাজসেবা প্রকল্প গ্রহণ, (ঘ) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো, (ঙ) গ্রাম ও আদিবাসী এলাকায় আরও বেশি কার্যক্রম পরিচালনা, (চ) পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃহত্তর উদ্যোগ, (ছ) নারী ও যুবকদের মধ্যে সংঘের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, (জ) আন্তর্জাতিক স্তরে হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি ও আদর্শের প্রচার। আরএসএস মনে করে যে ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজকে সংগঠিত করলেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

আরও জানুন

এই পৃষ্ঠাটি শুরুর বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করুন। আরএসএস-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট rss.org, সাম্প্রতিক প্রকাশনা, নির্ভরযোগ্য সূত্র ও গবেষণা প্রতিবেদন থেকে তথ্য যাচাই করে নিন। আরএসএস সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে সমর্থন ও সমালোচনা — উভয় দিকের উপকরণ পড়া জরুরি।